অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কাশ্মীর চলচ্চিত্র ভারতে রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দিচ্ছে


দিল্লির পুরানো কোয়ার্টারে একটি সিনেমা হলের বাইরে বলিউডের চলচ্চিত্র “দ্য কাশ্মীর ফাইলস”–এর একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে একটি অটোরিকশা যাচ্ছে। ২১ মার্চ ২০২২

১৯৯০–এর দশকের কাশ্মীরের ঘটনা নিয়ে নির্মিত একটি নতুন চলচ্চিত্রের অভূতপূর্ব বক্স-অফিস সাফল্য ভারতে রাজনৈতিক বিভাজনকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ছবিটি ভারতীয়দের তিন দশক আগে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া হিংসাত্মক অভিযানের পুনর্মূল্যায়নে প্ররোচিত করছে।

বিবেক রঞ্জন অগ্নিহোত্রী পরিচালিত “দ্য কাশ্মীর ফাইলস” নামের চলচ্চিত্রটি ১৯৯০–এর দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চল থেকে পণ্ডিত নামে পরিচিত কাশ্মীরি হিন্দুদের বিতাড়নের দৃশ্যপট নিয়ে তৈরি। একজন কলেজ ছাত্রকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। তার দাদা তাকে বলেছিলেন, তার কাশ্মীরি হিন্দু বাবা-মা দুর্ঘটনায় মারা যান। সে জানতে পারে, তারা দুর্ঘটনায় নয় বরং ইসলামি জঙ্গিদের হাতে নিহত হন।

ছবিটির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা অনুসরণ করে এবং নির্বাচনী কৌশল হিসাবে দেশের ২০০ মিলিয়ন মুসলমানদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করার দায়ে অভিযুক্ত৷

মুক্তির পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে ছবিটির পরিচালক ও প্রযোজকের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের কাজের প্রশংসা করেন।

একাধিক তারকারা এবং রাজনৈতিক নেতারাও ছবিটি দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি টুইট করেছেন, “দেখুন...যাতে নির্দোষদের রক্তে ভেজা এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয় #TheKashmirFiles।"

বিজেপি সমর্থিত দ্য কাশ্মীর ফাইলস

চলচ্চিত্রটির অনেক সমালোচকও রয়েছেন, যাদের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের সংঘাত-বিধ্বস্ত অঞ্চলের অনেকে রয়েছেন। সিনেমার নাটকীয় গুণাবলীর জন্য প্রশংসা করলেও সমালোচকেরা বলছেন যে, এতে কাশ্মীরের বহু বছরের সংঘাতের জটিল ইতিহাসকে অতি সরলীকরণ করা হয়েছে এবং এটি কাশ্মীরি মুসলমানদের সম্পর্কে একটি গৎবাঁধা ধারণা প্রকাশ করেছে।

লন্ডনে বসবাসকারী একজন কাশ্মীরি পন্ডিত এবং ঔপন্যাসিক, নিতাশা কৌল লিখেছেন, “ভারতে হিন্দু আধিপত্যবাদীরা কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দেশত্যাগকে তাদের অস্ত্রে পরিণত করেছে”।

"সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ভোগান্তি এবং ইসলামবিদ্বেষী বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে—সিনেমাটিতে সব মুসলমানকে হিংস্র, বর্বর বা কুৎসিত হিসেবে দেখানো হয়েছে”, তিনি লিখেছেন।

তিনি যুক্তি দেন যে, চলচ্চিত্রটির গল্প “ঘৃণা এবং প্রতিশোধের চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। এটি কাশ্মীরের ইতিহাস এবং রাজনীতিকে একটি ইসলামভীতিমূলক নৈতিকতার গল্পে পরিণত করে, যা হিন্দুত্ববাদী ভারতের জন্য মুখরোচক এবং লাভজনক”।

সুইডেনের উপসালা বিশবিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষণা বিভাগের প্রধান অশোক সোয়েন ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের সমর্থনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একজন হিন্দু ডানপন্থী চলচ্চিত্র নির্মাতার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

সিনেমাটির উদ্দেশ্য ইতিহাসের কথা বলা বা বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরি পন্ডিতদের সমর্থন করা নয়, সোয়েন বলেন, “এটি চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য অর্থনৈতিক লাভ এবং দেশে মুসলিম বিদ্বেষ বিক্রি করে শাসকের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা”।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

কাশ্মীর-ভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির মুসলিম নেতারাও চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করেছেন। পিডিপি নেত্রী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি জম্মু ও কাশ্মীরে থেকে যাওয়া কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য কিছুই করেনি।

এর আগে তিনি বলেন, এই “দুরভিসন্ধিমূলক” পদক্ষেপটি পুরানো ক্ষত নিরাময়ে কোনো অবদান রাখবে না।

মুফতি আরও যুক্তি দেন যে, একদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতারা মূলত লাভের জন্যে এরকম কাজ করছেন, অন্যদিকে মোদী এবং বিজেপি ধর্মীয় দাঙ্গাবাজদের প্ররোচিত করার জন্য ছবিটিকে ব্যবহার করছেন।

কাশ্মীরের বাসিন্দা সমীর কৌল ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন, ডকুমেন্টারি-ধরনে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে চিত্রিত কিছু লোমহর্ষক ঘটনা আসলে ঘটেছে, কিন্তু সিনেমাটি একটি মিথ্যা ধারণা দেয় যে, সমগ্র কাশ্মীরি মুসলিম সমাজ সহিংসতায় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে কিছু মুসলমান সহিংসতার বিরোধিতা করেছিলেন এবং বাকিরা ভয় পেয়েছিলেন।

একই মত প্রকাশ করেছেন এক কাশ্মীরি পণ্ডিত মেয়ে সাগরিকা কিসসু। “প্রত্যেক মুসলমান জঙ্গি বা সন্ত্রাসী সমর্থক নয়”, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন৷ “সবাইকে এক পাল্লায় মাপার সময় আমাদের খুব সংবেদনশীল হওয়া উচিত। এই ছবিটি সমগ্র কাশ্মীরি মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত তিক্ততা তৈরি করেছে”।

বাস্তব জীবনে এর প্রভাব

এদিকে সিনেমাটির প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ছে। সম্প্রতি দিল্লির একটি হোটেল একজন কাশ্মীরি ব্যক্তিকে উপযুক্ত পরিচয়পত্র এবং অন্য প্রমাণপত্র দেওয়ার পরও থাকার জন্য কক্ষ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হোটেলের অভ্যর্থনাকারী বলেছেন, দিল্লি পুলিশ হোটেল কর্তৃপক্ষকে বলেছে, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আসা অতিথিদের কাছ থেকে রিজার্ভেশন গ্রহণ না করতে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে দিল্লি পুলিশ এই ধরনের কোনো আদেশ জারি করার কথা অস্বীকার করে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হোটেল চেইন ওয়ো রুমস ওই হোটেলটিকে তাদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

প্রচার ও বিপণন ছাড়াও ছবিটি বিশাল ব্যবসা করছে, ভারতজুড়ে ৭০০টি হলে প্রদর্শিত হয়েছে এবং ১১ মার্চ মুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ৩০ লাখ ডলার আয় করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতেও প্রদর্শিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পর্দায় প্রথম সপ্তাহে সিনেমাটি ১৩ দশমিক ৮ লাখ ডলার আয় করেছে।

XS
SM
MD
LG